Homeজীবনযাপনস্ট্রেসে দমবন্ধ লাগছে? কাজে আসতে পারে ‘বক্স ব্রিদিং’

স্ট্রেসে দমবন্ধ লাগছে? কাজে আসতে পারে ‘বক্স ব্রিদিং’

রাত গভীর। বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছেন আকরাম। হাজার মাইল দূরে নেপালে পরিবারের সঙ্গে ঘুরতে গেছে তার বন্ধু। সেই শহরে ঘটে গেছে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস। বন্ধু ও তার পরিবারের কী অবস্থা, তারা নিরাপদে আছেন কি না— এসব চিন্তা মাথা থেকে কিছুতেই সরাতে পারছিলেন না তিনি। ঘুমও আসছিল না।

এমনঅবস্থায় কিছু করার নেই, শুধু অপেক্ষা আর উৎকণ্ঠা। অবশ্য এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের আকরামের ভরসা হয়ে ওঠে একটি সহজ শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল ‘বক্স ব্রিদিং’। কয়েক মিনিট ধরে নির্দিষ্ট ছন্দে শ্বাস নেওয়া, ধরে রাখা এবং ছাড়ার এই অনুশীলন তাকে ধীরে ধীরে শান্ত হতে সাহায্য করে।

ঢাকায় বসবাসকারী ২৩ বছর বয়সী এই যুবকের জন্য অবশ্য বক্স ব্রিদিং নতুন কিছু নয়। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি করতে গিয়ে যখন প্রচণ্ড মানসিক চাপে পড়েছিলেন, তখন একজন থেরাপিস্ট তাকে প্রথম এই কৌশলটি শেখান।

এরপর থেকে চাপের মুহূর্তে কিংবা রাতে ঘুম ভেঙে গেলে নিজের মনকে শান্ত করতে বক্স ব্রিদিং ব্যবহার করেন তিনি।

‘বক্স ব্রিদিং’ কী? 

নাম শুনেই বোঝা যায়, এর পুরো প্রক্রিয়াটি যেন একটি বক্সের চারটি সমান বাহুর মতো। প্রতিটি ধাপের সময়ও সমান।

শ্বাস-প্রশ্বাস প্রশিক্ষক স্টুয়ার্ট স্যান্ডেম্যানের মতে, প্রথমে চার সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিতে হবে। এরপর চার সেকেন্ড শ্বাস ধরে রাখতে হবে। তৃতীয় ধাপে চার সেকেন্ড ধরে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়তে হবে। সবশেষে শ্বাস ছাড়ার পর আরও চার সেকেন্ড শ্বাস বন্ধ রাখতে হবে।

অবশ্য চার সেকেন্ডই যে অনুসরণ করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কারও জন্য সময়টা কম বা বেশি হতে পারে। তবে চারটি ধাপেই সময়ের ব্যবধান সমান রাখা জরুরি।

সহজ এই প্রক্রিয়াটি কয়েক মিনিট করলেই কেউ কেউ স্বস্তি অনুভব করেন। আবার অনেকে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর্যন্ত অনুশীলন করেন।

কখন কাজে লাগতে পারে?

জীবনের এমন অনেক মুহূর্ত আছে, যখন শরীরের চেয়ে মনকেই বেশি সামলাতে হয়। পরীক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন, চাকরির সাক্ষাৎকার কিংবা কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত— এসব পরিস্থিতিতে উদ্বেগ ও চাপ বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন কোনো চাপপূর্ণ পরিস্থিতির আগে কয়েক মিনিট বক্স ব্রিদিং করা যেতে পারে। রাতে ঘুমানোর আগে বা হঠাৎ ঘুম ভেঙে উদ্বেগ তৈরি হলেও অনেকে এই কৌশল ব্যবহার করেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার ২৮ বছর বয়সী ব্রিটানি ল্যাম প্রতিদিন সকালে বক্স ব্রিদিং করেন। ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন এক সময় অনলাইনে এই কৌশলের সঙ্গে পরিচিত হন তিনি। এখন নিজের কাজেও এর ব্যবহার করেন।

ব্রিটানির মতে, ঘুম থেকে উঠে উদ্বিগ্ন বোধ করলে বক্স ব্রিদিং তাকে অতিরিক্ত চিন্তা থেকে বেরিয়ে বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগী হতে সাহায্য করে। এমনকি আবেগঘন কোনো বিষয় নিয়ে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কাজ করার সময়ও তিনি এই কৌশল ব্যবহার করেন।

আসলে শরীরে কী ঘটে?

প্রশ্ন হলো, শুধু শ্বাস নেওয়া আর ছাড়ার মতো সাধারণ একটি বিষয় কীভাবে স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করতে পারে?

চিকিৎসক হেলেন গ্যার বলছেন, বক্স ব্রিদিংয়ের শেষ ধাপটি এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শ্বাস ছাড়ার পর কিছুক্ষণ শ্বাস ধরে রাখা।

এই সময় শরীরে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়তে থাকে। মস্তিষ্ক যখন এই পরিবর্তন টের পায়, তখন শ্বাস নেওয়ার তাগিদ তৈরি হয়। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে শরীর কার্বন ডাই-অক্সাইডের এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখতে পারে।

আর সেখানেই তৈরি হতে পারে স্ট্রেস সামলানোর সক্ষমতা।

মানুষ যখন উদ্বিগ্ন বা চাপে থাকে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরন বদলে যায়। বক্স ব্রিদিং শরীরকে নিয়ন্ত্রিতভাবে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে সাহায্য করতে পারে। ফলে আতঙ্ক বা অতিরিক্ত চাপের অনুভূতিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

গবেষণাতেও মিলেছে ইতিবাচক ইঙ্গিত

বক্স ব্রিদিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে।

উত্তর আমেরিকায় পরিচালিত এক গবেষণায় উচ্চচাপের পরিস্থিতিতে এই কৌশলের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, বক্স ব্রিদিং উচ্চচাপের মুহূর্তে হৃদস্পন্দন এবং শরীরের অন্যান্য স্ট্রেস-সূচকের বড় ধরনের বৃদ্ধি ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে।

গবেষণাটি জুনে ‘কম্প্রিহেনসিভ সাইকোনিউরোএন্ডোক্রাইনোলজি’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। এতে টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো মিসিসাগার গবেষকেরা অংশ নেন।

চিকিৎসক হেলেন গ্যার এটিকে স্ট্রেস প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের অন্যতম কার্যকর প্রমাণভিত্তিক কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফুটবল মাঠেও

বক্স ব্রিদিংয়ের ব্যবহার শুধু সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও এর ব্যবহার রয়েছে।

স্টুয়ার্ট স্যান্ডেম্যানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নেভি সিলস সদস্যরা বিপজ্জনক বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যাওয়ার আগে বক্স ব্রিদিং করেন। উদ্দেশ্য—চরম চাপের মধ্যেও মনোযোগ ও মানসিক স্থিরতা ধরে রাখা।

তিনি ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়দেরও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করিয়েছেন।

অর্থাৎ পরীক্ষার হল থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন, খেলাধুলা কিংবা বিপজ্জনক অভিযান— চাপের ধরন আলাদা হলেও লক্ষ্য একটাই: শরীর ও মনকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে রাখা।

তবে জাদুর কাঠি নয়

বক্স ব্রিদিং অবশ্য কোনো জাদুর সমাধান নয়। সবার ক্ষেত্রে এর প্রভাবও একরকম নাও হতে পারে।

তবে উদ্বেগ বা মানসিক চাপের মুহূর্তে কয়েক মিনিট থেমে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দেওয়া যে শরীর ও মনকে কিছুটা স্থির করতে পারে, সেটিই এই কৌশলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

আকরামের জন্যও বক্স ব্রিদিং কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। মাঝেমধ্যে তার ঘুমের সমস্যা এখনও হয়। তবে পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে হয়, তখন তিনি জানেন— নিজেকে সামলানোর জন্য তার হাতে অন্তত একটি সহজ উপায় আছে।

হয়তো সেই কারণেই বক্স ব্রিদিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি এর সরলতায়।

কোনো যন্ত্র নেই, বিশেষ জায়গার প্রয়োজন নেই। শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্য থামতে হবে, নিজের শ্বাসের দিকে মন দিতে হবে এবং চারটি সমান ধাপে শরীরকে মনে করিয়ে দিতে হবে— এই মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণটা এখনও আপনার হাতেই।

সূত্রঃ যমুনা টিভি

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments