Homeবিনোদনআইয়ুব বাচ্চুর ক্যারিশমা ছিল ঈশ্বর প্রদত্ত

আইয়ুব বাচ্চুর ক্যারিশমা ছিল ঈশ্বর প্রদত্ত

স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে হাতেগোনা যে কজন বাংলা ব্যান্ড মিউজিককে শীর্ষে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের একজন আশিকুজ্জামান টুলু। তার হাত দিয়েই প্রথম অডিও ‘ব্যান্ড মিক্সড’ অ্যালবাম ধারণার সূচনা হয়েছিল। ‘চাইম’ গড়েছেন, ছেড়েছেন। পরবর্তীতে ‘আর্ক’কে শ্রোতাপ্রিয়তার তুঙ্গে নিয়ে গেছেন। সেই জনপ্রিয়তার মধু না খেয়ে চলে গেছেন ‘দূর পরবাসে’। অনেক দিন ধরেই তিনি বসবাস করছেন কানাডাতে।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বাংলা রক মিউজিকের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে একটি পোস্ট দেন আশিকুজ্জামান টুলু। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা এই গিটারিস্টকে নিয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেন তিনি। পোস্টটি যমুনা নিউজের পাঠকের জন্য এখানে তুলে ধরা হলো—

বাচ্চু ভাইয়ের (আইয়ুব বাচ্চু) সাথে আমার যে খুব ওঠাবসা ছিল, ব্যাপারটা তা নয়। কালে-ভদ্রে দেখা হতো। দেখা হওয়া মাত্র একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে উনি বলতেন– টুলু ভাই, কী খবর? বাচ্চু ভাই বয়সে আমার বড় ছিলেন কিন্তু সংগীতের শুরু আমাদের এক সময়েই বলে আমার ধারণা। তারা শুরু করেছিলেন চট্টগ্রামে আর আমরা ঢাকায়, তবে শুরুর সময়টা মনে হয় একই।

এখানে ছোট্ট একটা বিষয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ওনার সেন্সিবিলিটি ও সেলফ রেসপেক্ট কত প্রখর। উনি চাইলেই আমাকে প্রথম থেকেই তুমি সম্বোধন করতে পারতেন কিন্তু তা করেননি। উনি আমাকে সম্মান দিয়েছেন এবং আমিও ওনাকে সেভাবেই ‘বাচ্চু ভাই’ সম্বোধন করে সম্মান করে গেছি। উনি বুঝতেন আমাকে, আমিও বুঝতাম ওনাকে। দেখা কম হওয়া মানেই বন্ধুত্ব কম, তা নয়। যেমন কিছু প্রেম কোনোদিনই কোনো আকার নেয় না, কোনো অস্তিত্বের বেড়াজালে আটকে যায় না কিন্তু দুজনের চোখে চোখ পড়া মাত্র বোঝা যায়— দেয়ার ইজ সামথিং এলস দ্যাট কান্ট এক্সপ্লেইন অর পুট ইন আ শেপ।

আইয়ুব বাচ্চু খুব ভালো গিটার বাজাতেন, ভালো গান গাইতেন, ভালো সুর করতেন, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই কিন্তু আজ অবধি তার একটা বিষয়ে একজনকেও বলতে দেখিনি। আপনারা কি খেয়াল করেছেন, আইয়ুব বাচ্চু অসম্ভব ক্যারিশম্যাটিক ছিলেন? ওনার সাথে প্রথম দেখাতেই কেমন যেন আপন মনে হতো। উনি যা বলতেন, শুনতে ভালো লাগতো। উনি যা গাইতেন, যা বাজাতেন, তাই ভালো লাগতো। আপনারা কি কেউ কখনও ভেবে দেখেছেন, কেন এই ভালোলাগাটা তৈরি হতো? হ্যা, এটাই ওনার ক্যারিশমা ছিল। এটা ঈশ্বর প্রদত্ত। আপনি চাইলেই নিজের মধ্যে এটা তৈরি করতে পারবেন না।

আরেকটা বিষয় আমি খেয়াল করেছি– আইয়ুব বাচ্চুর সাথে পিওন, চাপরাশি, দোকানদার, রিকশাওয়ালা, ড্রাইভার, মিউজিশিয়ান, সিংগার, প্রোডিউসার সবার সাথে ভীষণ ভালো সম্পর্ক ছিল। অহংকার ছিল না বললেই চলে। আমি আইয়ুব বাচ্চুকে কোনোদিন দেখিনি, কাউকে ছোট করে কথা বলা কিংবা অপমান করতে। এসব কারণেই মানুষ ওনাকে অসম্ভব ভালবাসতো এবং বাসে। যেভাবে ভালবাসতো আজম খানকে। এই আজম খান আরেকজন মাটির মানুষ, যিনি এই দেশে রক আর পপ মিউজিককে স্ট্যাবলিশ করার পরেও মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত এক কণা ইগোকে স্থান দেননি মনে। আসলে এরাই প্রকৃত শিল্পী, যারা চলে যাওয়ার পর মানুষ কাঁদে যুগ যুগ ধরে।

বাচ্চু ভাইয়ের যারা ভক্ত, তাদের খুশি করার জন্য আমার এই লেখা নয় বরং আজ কেন যেন ওনাকে খুব মিস করছি। আজ একটা ভিডিওতে দেখলাম, ওনাকে নিয়ে কথা বলেছে। হ্যাঁ, উনি চলে যাওয়ার পর আমি বলেছিলাম– ‘এলআরবি’ বন্ধ করে দেওয়া উচিত। হয়তো তখন অনেকে আমার ওপর রাগ করেছিলেন। আমার যা ঐ মুহূর্তে মনে হয়েছিল, তাই বলেছি।

দেখেন, আইয়ুব বাচ্চু এমন একটা সৃষ্টি, যাকে আপনি অন্যভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন না। ওনার সুর, গায়কি, বাজানো, কম্পোজিশন এতো ইউনিক যে, আপনি ট্রাই করলেই মনে হবে আরোপিত। তাই বাচ্চু ভাইয়ের অবর্তমানে ওনার গান আপনি যতোই গলা নকল করে গান না কেন, ওনার বাজানো নোটগুলোকে যতোই ওনার মতো করে বাজান না কেন; পারবেন ঐ টোন, ঐ এক্সপ্রেশন, ঐ টাইমিং এবং ঐ ব্যান্ড রেপ্রেজেন্টেশন একজ্যাক্ট পোট্রে করতে?

সম্ভব নয়। কাল যদি ডেভিড গিলমোরসহ ‘পিংক ফ্লয়েড’-এর সবাই গত হয়ে যান, আরেকটা পিংক ফ্লয়েড কি শুরু করা উচিত হবে? আপনারা কি ডেভিড গিলমোরকে রিপ্লেস করতে পারবেন? 

ঠিক তেমন আপনারা কি বাচ্চু ভাইকে রিপ্লেস করতে পারবেন বা পারতেন? শুধু নাম ব্যবহার করে ব্যান্ড করলেই তো ওনাকে বাঁচিয়ে রাখা হয় না, ওনার গান গাইলেই আইয়ুব বাচ্চুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সেটা যথেষ্ট। তার মানে আমি বলছি না যে, ওনার গান কেউ গাইতে পারবেন না। ওনার গান না গাইলে এক সময় তা কালের আবর্তে হারিয়ে যাবে। শুধু ওনার রেকর্ড করা গান এই প্রজন্ম বুড়ো হওয়া পর্যন্ত শুনবে, তারপর হারিয়ে যাবে। 

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা মান্না দের গান যদি ওনারা ছাড়া অন্য কেউ না গাইতো, হয়তো এই প্রজন্মের অনেকেই মন দিয়ে শুনতো না বা জানতেই পারতো না মান্না দে বা হেমন্তদের নাম। গান বিষয়টা হচ্ছে নদীর পানির মতো, শত শত জনপদ পার হয়ে যাবে আর নিজের ছোঁয়া দিয়ে যাবে প্রতিটি ঘাটে ঘাটে। নদীকে আটকে রাখলে কিংবা গতিবিধি বদলে দিলে ১০০ মাইল দূরের কেউ জানতেই পারবে না, মধুমতি নামের কোনো নদী আছে বা ছিল। একবার এক শিষ্য শাহ আবদুল করিমকে বললো– ওস্তাদ, ওরা আপনার গান করে কিন্তু আপনার নাম বলে না। এ কথা শুনে শাহ আবদুল করিম বলেছিলেন– নাম না নিক, অসুবিধা নাই। গানের বাণীটা মানুষের কাছে পৌঁছাইলে এবং সেটা বুঝতে পারলেই চলে।

বুঝতে পেরেছেন ওনার ফিলসফিটা? কথাটা তো অসম্ভব সত্য। আজ বাচ্চু ভাই নাই, কাল আমরা থাকব না, ২০০ বছর পর কেউ হয়তো জানবেও না, আইয়ুব বাচ্চু বলে কেউ ছিল কিন্তু ওনার সৃষ্টি ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’ গানটা কোনো এক পাড়ায় কোনো এক অপরিচিত ছেলে কিংবা হিউম্যানয়েড কোনো রোবট গানের হিউজ ডেটাবেইজ খুঁজে বের করে গেয়ে উঠবে। হয়তো মানুষের চাইতেও ভালো করে ও গাইবে।

তাই আমার মনে হয়, গানকে বান দেওয়ার দরকার নাই। যার মনে হয়, সেই গেয়ে উঠুক– ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’। তবে লাকি আখান্দের সুরে, কাওসার আহমেদ চৌধুরীর লেখা এবং সামিনা চৌধুরীর গাওয়া ‘আমায় ডেকো না’ গানটাকে নিয়ে এত মোচড়ামুচড়ি করবেন না প্লিজ। এটা কোনো ক্যাবারের গান নয়, যেখানে নায়িকাকে ফেলে রেখে নায়ক চলে যাওয়ার পর ভিলেন এসে বলাৎকার করার পর নায়িকা মনের দুঃখে যৌবনভিত্তিক জটিলতা নিয়ে গলায় এবং চেহারায় ক্যাবার ভিত্তিক ছলনা এনে গানটি গাইবে। এটা একটা সাধারণ গান। তাই এখানে এতো ছলনা কিংবা একই গানের মুখে ‘মাঝি বাইয়া যাওরে’ গলার টোন এবং অন্তরায় গিয়ে অপেরা হয়ে যাওয়ার বিষয়টা অভূতপূর্ব হলেও কিছুটা অস্বাভাবিক।

প্রসঙ্গে ফিরি। বাচ্চু ভাই বেশ ওয়েল বিল্ড ছিলেন, খুব টাফ লাগতো ওনাকে দেখে। অথচ একটা মজার বিষয় হলো, ওনার হাত খুবই নরম ও মোলায়েম ছিল। যতোবার হাত মিলিয়েছি, ওনার ফিজিকের সাথে হাতের মোলায়েমত্বকে মেলাতে পারিনি, একটা বিভেদ পরিলক্ষিত হয়েছে। অ্যাটলিস্ট আমার কাছে তাই মনে হয়েছে।

আমরা যখন ঢাকায় ‘ফ্রিজিং পয়েন্ট’ করি ১৯৮০ সনে, বাচ্চু ভাইরা তখন চট্টগ্রামে সম্ভবত হোটেল আগ্রাবাদে বাজান ‘সোলস’ হিসেবে। ফ্রিজিং পয়েন্টের লিড গিটারিস্ট ও লিডার ছিল শুভ্র। শুভ্র আমার বন্ধু ও বেইজ গিটার শিক্ষক। ওই আমাকে বেইজ গিটার ধরিয়েছিল। অসম্ভব ট্যালেন্টেড একজন লিড গিটারিস্ট ছিল শুভ্র। এক্সট্রিমলি ইমোশোনাল এবং ক্রিয়েটিভ। ও তবলা, ড্রাম, গিটার, কিবোর্ড, সেতার সবকিছু স্কিলফুলি বাজাতে পারতো। ভীষণ চঞ্চল ও অস্থির ছিল ও। ওকে আমরা মানিয়ে চলতাম, যা বলতো, তাই শুনতাম। এক রত্তি দ্বিমত করতাম না, একেবারে শিক্ষকের মতো করে ওকে মানতাম। ও যখন যেখানে যাওয়ার কথা বলতো, বাসায় অসুবিধা থাকলেও চলে যেতাম।

সাইন্স ল্যাবরেটরি ও এলিফেন্ট রোডের মোড়ে ইমতিয়াজ, যে ছিল আমাদের ফ্রিজিং পয়েন্টের ভোকালিস্ট, ওর বাসার ছাদে করতাম রিহার্সাল। আমি বেইজ, শুভ্র লিড, সিরু ড্রামস আর ইমতিয়াজ ভোকাল। আমাদের কোনো কিবোর্ডিস্ট ছিল না। তবে একবার আমরা মানামকে (মানাম আহমেদ) অফার করেছিলাম কিবোর্ড বাজানোর জন্য। তখন মানাম কেবল কিবোর্ড বাজানো শুরু করেছে। কিবোর্ডের আগে ও ভাইব্রাফোন বাজাতো রেকর্ডিংয়ে। ও তখন দুদিন সময় নিয়েছিল আমাদের জানানোর বিষয়ে। পরবর্তীতে জানিয়ে দেয়, মাইলস অফার করেছে বাজাতে, ও মাইলসের সাথে বাজাবে। এরপর আমাদের ব্যান্ডে আর কিবোর্ড বাদক নেওয়া হয় নাই।

হঠাৎ একদিন শুভ্র বললো, আমরা চিটাগং যাবো। ওখানে আগ্রাবাদ হোটেলে সোলসের সাথে বাজাব। সবাই তরুণ, পকেটে সেরকম কোনো টাকাপয়সা নাই। হয়তো দিনখানেক চলতে পারব। কোথায় থাকব, কী খাব, কিছুই জানি না। যেহেতু শুভ্র বলেছে, যাইতে হবে। আগ্রাবাদের মালিকের মেয়ে ছিল আমার স্কুলের বান্ধবী। মনে মনে ভাবলাম, যাই চইলা, কোনো ঝামেলায় পড়লে বান্ধবীরে ফোন দিয়া কমু– তোর বাপরে ক, আমাগো রুম দিতে। পরেরদিন ঠিকই রওনা দিয়ে দিলাম চিটাগং আগ্রাবাদ। ওখানে গিয়েই বাচ্চু ভাইয়ের সাথে প্রথম দেখা হলো। শুভ্রর বাজানো দেখে উনি খুব প্রশংসা করেছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে সবার শুরু একটা বিন্দু থেকেই হয় কিন্তু পরবর্তীতে প্রত্যেকের প্রচেষ্টা, একাগ্রতা, আগ্রহ, পরিশ্রম, স্কিল ও ট্যালেন্ট একেকজনকে একেক স্থানে অধিষ্ঠিত করে দেয় এবং এটাই বাস্তবিকতা। ‘সারারাত তুমি হেঁটেছ আমার নিঝুম স্বপ্নপথে’ গানটা ছিল প্রথম বাচ্চু ভাইকে দিয়ে গাওয়ানো আমার প্রথম গান, প্রথম কম্পোজিশন। পরবর্তীতে করেছিলাম কিছুটা ব্লুজ টাইপের একটি গান ‘বিবর্ণ স্মৃতির কুয়াশার চাদরে’। ‘সারারাত তুমি’ গানটা দুইবার কম্পোজ করি টোটালি দুইটা ভিন্ন সুরে অর্থাৎ কথা এক কিন্তু একটার সুর বাংলা পপ এবং আরেকটা একেবারেই বাংলা সেমি ক্লাসিক্যাল ধারার। পপ ঘরানারটা গেয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু, সেমি ক্লাসিক্যালটি গেয়েছিলেন নওশীন কিবরিয়া। এটা একধরনের এক্সপেরিমেন্ট ছিল আমার। গানটার বাণী ও বিষয়বস্তু ছিল বেশ গভীর এবং একটা ভিন্ন ক্যারেক্টার ছিল গানটার কথায়। যে কারণে একই কথায় দুইভাবে সুর করায় কোনো ধরনের সাংগীতিক ‘গুরুচণ্ডালী দোষ’ মনে হয়নি।

গানের ব্যাপারে কিছুটা বিবরণ দিলাম তবে তার চাইতে অনেক ইন্টেরেস্টিং বিষয় ছিল গানটির টোটাল প্রডাকশন প্রসেসটা। এটা ছিল বাংলাদেশের প্রথম মিক্স অ্যালবাম ‘স্টার্স’-এর দ্বিতীয় সংস্করনের একটা গান। গানটা সুর করার আগেই বাচ্চু ভাইকে মনে মনে সামনে বসিয়ে সুরটা করেছিলাম। চেষ্টা ছিল ওনাকে যাতে পোর্ট্রে করতে পারি গানটার মধ্যে।

‘স্টার্স’ সেকেন্ড অ্যালবামের কন্ট্রাক্ট পেয়েই বাচ্চু ভাইকে গান গাওয়ার অনুরোধ জানালাম। উনি এক কথায় বললেন, আমি আছি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম– বাচ্চু ভাই, আপনার সম্মানিটা..? উনি নব্বই দশকের একমাত্র ব্যাক্তি, যিনি আমাকে কোনো অ্যামাউন্ট বললেন না, শুধু বললেন– যা ইচ্ছা, দিয়ে দিয়েন। আমি জানি না, কেন এমন বলেছিলেন। ঠিক ওনার মতো করে আরেকজন একই কথা ভিন্ন ডায়লেক্টে বলেছিলেন।

১৯৮১/৮২ এর দিকে যখন আজম খান ভাইয়ের প্রথম ক্যাসেট অ্যালবাম করার জন্য ওনার বাসায় গিয়ে বলেছিলাম– আজম ভাই, আপনার একটা ক্যাসেট অ্যালবাম কম্পোজ করে রিলিজ করতে চাই, যেখানে আপনার পুরোনো গান এবং আমার করা নতুন গান থাকবে। আপনাকে সম্মানি কত দিতে হবে? উনি বললেন– দিয়া দিও, যা ইচ্ছা। আমি– আপ্নে কন, কত দিমু? আজম ভাই– আরে মিয়া, কইলাম না, যা ইচ্ছা, দিয়া দিও!

আসলেই তাই ঘটেছিল। আমি যা দিয়েছিলাম, আজম ভাই তাই নিয়েছিলেন। একটা কথাও বলেননি। বাচ্চু ভাই একজ্যাক্টলি তাই করেছিলেন। ওনার গান গাওয়া শেষ হওয়ার পর যখন খামটা দিলাম, উনি খুলেও দেখলেন না। এটা কোনো বানানো গল্প নয়, এটা বাস্তব ঘটনা।

যাইহোক, আসি প্রজেক্টে কীভাবে হলো গানটা। বাচ্চু ভাইকে গানটা ক্যাসেটে খালি গলায় গেয়ে পাঠিয়ে দিলাম। রেকর্ডিংয়ের দিন ধার্য করে জানালাম ওনাকে। আমি এটাও জানালাম– বাচ্চু ভাই, আমি শুধু কর্ডের স্ক্যালিটন, রিদম কম্পোজ আর কিবোর্ড সেকশনটা বাজায় রাখব। আপনি এসে পুরো গিটার সেকশনটা আপনার ইচ্ছামতো করবেন। যা মনে হয়, তাই বাজাবেন। এমনকি যদি মনে করেন, আমার কর্ড সেকশন বা রিদম, কিবোর্ড রাখবেন না, সেটাও আপনার পূর্ণ স্বাধীনতা।

এটা বলার কারণ দুইটা। প্রথমত আমি জানি, উনি নিজেও কম্পোজার, তাই উনি যা ভেবে আসবেন তা অবশ্যই ভালো হবে, যা নিয়ে একবিন্দু চিন্তার কিছু নাই। দ্বিতীয়ত উনি নিজেই গাইবেন গানটা, যা ওনাকে রেপ্রেজেন্ট করবে, তাই উনি বেস্ট জিনিসটাই এখানে দেবেন। এসব কারণে আমি একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে গেলাম। আসলে একজন কম্পোজারের সাথে যখন আরেকজন কম্পোজার যোগ হয়, তখন ভ্যারিয়েশন, গ্রুভ, ক্রিয়েটিভিটি অন্য লেভেলে চলে যায়। টেনশন থাকে না।

উনি সময় মত চলে আসলেন সাউন্ড গার্ডেনে (যেখানে নব্বই দশকের বেশিরভাগ অ্যালবাম রেকর্ড হয়েছিল)। আমি প্যানেলে চুপচাপ শান্তশিষ্ট বাচ্চার তো বসে থাকলাম। উনি মবিনকে (সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও মিউজিশিয়ান) বললেন, টেপটা চালাতে। মবিন টেপ ছেড়ে দিলো। উনি কয়েকবার শুনলেন এবং বাজাতে শুরু করলেন।

আমার একটা এক্সপেক্টেশন ছিল, বাচ্চু ভাই ডিস্টরশন ইউজ করবেন। আজব ব্যাপার! উনি হাতে করে শুধু একটা অ্যাকোস্টিক গিটার নিয়ে এসেছিলেন এবং সেটা নিয়েই রেকর্ডিং বুথে ঢুকে গেলেন। বাজানো শুরু হলো। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ওনার বাজানো শুনতে থাকলাম। কিচ্ছু বলার মতো শক্তি বা ইচ্ছা ছিল না। উনি ওনার মতো করে বাজালেন। আরেকটা উল্লেখ্য বিষয়, উনি আমার করা কম্পোজিশনের একটা নোটেও হাত দিলেন না। ওটার উপরেই সব কিছু বসিয়ে দিলেন।

বাজানো শেষ হয়ে গেলো। পুরো শিফট নেওয়া ছিল। আমরা একটা ব্রেক নিয়ে আবার প্যানেলে ঢুকলাম। এবার উনি গাইতে শুরু করলেন। খুব বেশি টেক দিতে হলো না। গাওয়া হয়ে গেলো ঠিকঠাক। গান গাওয়ার সময় মিউজিক ডিরেক্টর সাধারণত তার পছন্দমতো কিছু কিছু জায়গায় নির্দেশনা দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে আমার কিছুই বলতে হয়নি। সেই শান্ত বাচ্চার মতোই বসেছিলাম এবং সুন্দর করে টোটাল প্রজেক্টটা শেষ হলো ওনার সাথে। আসল বিষয় হচ্ছে ‘সামাঝদারকে লিয়ে ইশারাই কাফি’। অর্থাৎ যে বোঝে তাকে আবার বোঝানো বোকামির শামিল।

বহু বছর পার হয়ে গেছে। এখনও ‘ড’তে বসে কাজ করি আর মাঝে মাঝে ভাবি– কোথায় গেলো মবিন, কোথায় গেলো নিলয় (নিলয় দাশ), কোথায় গেলো বাদল (সারগাম স্টুডিওর কর্ণধার), কোথায় গেলো শাফিন ভাই (শাফিন আহমেদ) আর কোথায় গেলো বাচ্চু ভাই? আর সাথে করে নিয়ে গেলো আমাদের বেড়ে ওঠা নব্বই দশক।

সূত্রঃ যমুনা টিভি

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments